মায়ের বিয়ের গয়না

মায়ের বিয়ের গয়না aadharalo.com
মায়ের বিয়ের গয়না aadharalo.com

আচমকা মোচড় দিয়েই পেট ব্যথা করে উঠলো। পেটটা ধরে কাতরাতে কাতরাতে বাড়ির উঠানে ঠাস করে নেতিয়ে পড়েছি। মা, দূ….রে পাকের ঘরে মাটির চুলায় ভাত রাঁধতেছে । উঠান থেকে একটু দূরে খোলা আকাশের নিচেই আমাদের ছোট্ট পাকের ঘর ।

হঠাৎ এদিকে তাকাতেই মা ভাত রাঁধা কোথায় ছুঁড়ে ফেলে, হাঁপাতে হাঁপাতে দৌঁড়ে ছুটে আসছে আমার কাছে , মা-র বিষন্ন মুখটা যেন ভেসে উঠছে আমার দুই চোখে ।

Advertisements

পরক্ষণেই বাতাসে মায়ের গলার আওয়াজ স্পষ্ট ভেসে আমার কানে বেজে উঠলো ,
“পল্টু কি হইলো রে তোর, বাপ আমার , কি হইলো তোর” । তারপর আমার আর কিছু মনে নাই ।

চোখ মেলে দেখতে পেলাম , আমাদের ভাঙা টিনের ঘরে উলুতে খাওয়া কাঠের চকিতে আমি চিৎ হয়ে শুয়ে আছি । গায়ে ছেঁড়া কেথা মোড়ানো । আমার মাথার কাছে আনমরা হয়ে বসে আছে মা , মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে । এ যেন এক আলাদা তৃপ্তি ।

কেথাটা গা থেকে সরিয়ে মাথাটা উঁচু করে, মাকে জিজ্ঞাসা করলাম,
মাগো কি হইছে মোর ? মা কোনো উত্তর দিলো না ।

আমার অসুখ পড়েছে

ঘন্টা খানেক পর বাইরে তাকাতেই চোখে পড়ে, আমাদের গ্রামের ডাক্তারের সঙ্গে মা কথা বলছে । আমি ক্লান্ত শরীরে বিছানা থেকে উঠে টিনের ফাঁক দিকে আড়াল থেকে সব শুনি । বড় একটা অসুখ হয়েছে আমার । শহরে নিয়ে যেতে বলেছে । তাড়াতাড়ি চিকিৎসা করাতে না পারলে মারাও যেতে পারি । ডাক্তার বলছিলো , চিকিৎসার জন্য নাকি অনেক টাকার প্রয়োজন ।

কিন্তু মা-ব্যাটার অভাবী সংসার । বাবা আমাদের নিঃস্ব করে চলে গেছে, পার হয়ে গেছে অনেক বছর । শুনেছি আরেকটা নাকি বিয়ে করেছে ।
অথচ মা ফের বিয়ে করেনি শুধুমাত্র আমার অসহায় মুখটার দিকে তাকিয়ে ।

মা অন্যের বাড়িতে দিনরাত খাটে। আমার আবদার, আহ্লাদ পূরণ করে , পড়ালেখার খরচ চালায় । অভাবী সংসারে আবার সঞ্চিত অর্থ ,
“দিন আনে দিন খায়” অবস্থা বলে যাকে ।

অন্যদিকে মা খুব দুশ্চিন্তায় দিন-পার করতেছে । আমাকে কিচ্ছু বুঝতে দিচ্ছে না ।

মা-কে ডেকে বললাম, মা মোর চিকিৎসা করাইতে হইবো না । আমি এমনাই ভালো হইয়া যামু । মা চোপ করে রইলো, কিছু বললো না ।
মা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে শুধু কাঁদছে আর কাঁদছে ।

ঘটনা তখনো চলমান

আজ মঙ্গলবার, বাইরে খুব বৃষ্টি হচ্ছে । মা ঘরে নেই । হঠাৎ দেখি মা ভিজতে ভিজতে কোথা থেকে ঘরে ঢুকলো । মা একটু চাপা-স্বভাবের ছিল, দুঃখ-কষ্ট কাউকে বুঝতে দিতো না । অনেক কষ্টে মা-র মুখ থেকে কথা বের করতে সক্ষম হয়েছি ।
মা-র বিয়েতে দেওয়া গয়না বিক্রি করে দিয়েছে ।
মা কাঁদো কাঁদো সুরে বলছে,
” এই ট্যাকা দিয়া তোকে ভালা কইরা তুলুম বাবা ” ।

আমি মাকে বলেছি, “এই ট্যাকা দিয়া আমি চিকিৎসা করাইতে পারুম না মা “।
মা আমাকে চোপ করিয়ে বলে,
” তুই যদি ভালা থাকিস মোর কি গয়নার কমতি থাকবেরে ব্যাটা , তুই তো মোর সম্পদ, তুই কামাই কইরা মোরে ফের গয়না কিন্না দিবি” ।
আমি কাঁদতে কাঁদতে মাকে জড়িয়ে ধরলাম ।

” হ্যাঁ মা, আমি তোকে কামাই কইরা অনেক গয়না কিনা দিমু মা “।
এদিকে দেখতে দেখতে জীবনের অনেক অধ্যায় পার হয়ে গেছে ।

অনেক বছর কেটে গেছে

আজ ফের মঙ্গলবার । অনেক বছর কেটে গেছে । বাইরে ফের মুসুল ধারে বৃষ্টি পড়ছে । আর সেই বৃষ্টির দিনের মতো বারান্দায় দাঁড়িয়ে নেই ছোট্ট পল্টু ।
মা-র বিক্রি করা গয়না দ্বিগুন টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছি পাশের গ্রামের মোড়লের কাছ থেকে ।

অনেকদিন পর গ্রামের বাড়িতে এসেছি । দোতালার উপরের ঘরের দেয়ালে বড় করে টাঙানো মা-র ছবি । ছবিতে মালা ঝুলছে । মায়ের গয়না হাতে নিয়ে মা-র ছবির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি আমি । বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে । চারিদিক অন্ধকার । বিদুৎ চলে গেছে ।
মোমবাতি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি মা-র ছবির সামনে।

কেন জানি, মা-র কথা ভাবতে ভাবতেই চোখে জল এসে গেছে । কিছুতেই কান্না থামাতে পারছি না । বৃষ্টি হলেই মা-র কথা খুবই মনে পড়ে যায় । মা গত হয়েছে আজ ১২ বচ্ছর পূর্ণ হলো । জীবনে যার জন্য সুখ খোঁজা সেই মা আজ আমার পাশে নাই ।
সব থেকেও যেন আজ আমি অসুখী ।

অজানা একটু সুখের খোঁজে গ্রামের বাড়িতে চলে আসি, উপরের ঘরে চলে যাই , মায়ের ছবির দিকে পলকহীনভাবে তাকিয়ে থাকি ।